Header AD

ফুলের রাজধানী গদখালী

গদখালী

 




অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভরা ফুলের শহর আপনাকে সত্যিই মাতিয়ে তুলবে।চারদিক ফুল আর ফুল,নানান রকমের ফুল।এই বিভিন্ন রকমের ফুল যেন আমাদেরকে পাগল করে তুলতে শুরু করেছে।বিভিন্ন ধরনের ফুলের ঘ্রাণ যেন পাগল করে তুলেছে এই যশোরের গদখালী-পানিসারা।

আমরা ৫ জন বন্ধু ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করলাম যশোরের উদ্দেশে সাতক্ষীরার গাড়িতে।যশোরে যেতে হলে সাতক্ষীরা বা বেনাপোল যেকোন একটাতে আপনি টিকিট নিতে পারেন । ফেরীঘাটে কুয়াশার কারনে ৯ ঘণ্টা সময় লেগে গেল।আমরা গাড়ি থেকে নামলাম যশোর চাচড়া-চেকপোস্ট।ইচ্ছা করলেই একবারেই ফুল রাজ্য গদখালী বাজার নামতে পারতাম।আগে থেকেই আমরা ইন্টারনেট ঘেটে জেনেছি যশোর চাচড়া থেকে দড়াটানা দিকে আসতেই আছে সেই দুইশত বছরের পুরানো কালেক্টর ভবন।যেটি এখন ডি সি অফিস নামে পরিচিত।আমরা জানতে পারলাম ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলার প্রথম জেলা যশোর।বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রথম স্বাধীন হওয়ার গৌরব বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই যশোর জেলা।যশোর নাম করন নিয়েও মতবেদ রয়েছে।কারোর মতে যশোহর থেকে যশোর।আবার কারো মতে আরবী যসোর থেকে যশোর যার অর্থ  সেতু বা সাঁকো তবে ঐতাহাসিকদের মতে গৌড়ের রাজার যশ হরন করে রাজা বিক্রমাদিত্য যে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন সেই যশোহর থেকেই যশোর নামের উৎপত্তি হয়েছে।১৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান যশোর,খুলনা,কুষ্টিয়া,বনগা এবং ফরিদপুরের কিছু অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এই যশোর রাজ্য।১৭৪৭ সালে যশোর নাটরের রানী ভবানির রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়।তবে ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ শাসকগণ যশোরকে জেলা হিসাবে ঘোষণা করেন। ১৭৮৬ সালে নির্মিত হয় দৃষ্টি নন্দন স্থাপত্যশৈলী অনন্য নিদর্শন যশোর কালেক্টরেট ভবন।এটি ছিল সে সময় বাংলার দীর্ঘতম ভবন।মূল কাঠামো এবং নান্দনিক সৌন্দর্য্য অখুন্ন রেখে ১৯৮২ এটিকে দোতলায় রূপান্তরিত করা হয়।বর্তমানে এটি জেলাপ্রশাসকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।যশোরকে বলা হয় প্রথম ডিজিটাল জেলা।যশোর জেলার হাত ধরেই মূলত ডিজিটাল বাংলাদেশের পথ চলা।মাননীয় প্রধান মন্ত্রী ২০ ডিসেম্বর ২০১২ সালে প্রথম যশোরকে ডিজিটাল জেলা ঘোষনা করেন।যশোরের এক মহা গৌরবের নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আমরা আরো জানতে পারলাম এই যশোরেই জন্মগ্রহন করেছেন বিখ্যাত  জ্যোতিষ্ক বিঞ্জানী রাধা গোবিন্দ চন্দ্র।খ্যাতিমান অভিনেতা ও লেখক ধীরাজ ভট্টাচার্য।কবি-গীতিকবি এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান আরো অনেকে।
আমরা চাচড়া-চেকপোস্ট থেকে বেনাপোলের গাড়ি ধরে চলিলাম ফুলের শহর গদখালীর উদ্দেশে।আমরা আগেই জেনেছি যশোর সবজী চাষের জন্য বিখ্যাত।রাস্তার দুধারের বিশাল এলাকা জুড়ে সবজীর ক্ষেত তা প্রমাণ করে দেয়।

আমরা এর মধ্যেই চিন্তা করলাম ফুল রাজ্য গদখালী দুপুরের পরে যাব।আমরা সোজা গেলাম এশিয়ার সবচেয়ে বড় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর বেনাপোল।প্রাধানত ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্যের ৯০ ভাগ সম্পাদিত হয় এই স্থল বন্দর বেনাপোল দিয়েই।চারদিক বাণিজ্যের সমারহ বিভিন্ন পণ্য দেখেই তা প্রমান করে।

বেনাপোল থেকে দুপুরের খাবার সেরে আবার ফুল রাজ্য গদখালীর উদ্দেশে রওনা হলাম।আমরা গদখালী পোছালাম বিকাল প্রায় তিনটয়।গদখালী বাজার থেকে আমরা একটি ভ্যান নিয়ে রওনা দেই গদখালী-পানিসারার দিকে।বাজার পার হতে না হতেই রাস্তার দুপাশে যতদুর চোখ যায় ফুলের ক্ষেত আর ক্ষেত।নানান রঙের নানান করম ফুল। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই পানিসারা পৌছে গেলাম।পানিসারা মোড়ে নামতেই চোখ জুড়িয়ে গেল।যেন তর সইছে না।সময়টা জানুয়ারির শেষ তাই ফুলের বাহার চারদিকে।ভাড়া মিটিয়ে দিয়েই আমরা ভাবতেই পারছি না কোনদিক যাব।চারদিক ফুল আর ফুল।আমাদের মত অনেক পর্যটক এসেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে।দেখে বোঝাযাচ্ছে যে বিভিন্ন মন্ত্রনালয় থেকেবিভিন্ন বড় বড় অফিসাররা এসেছে পুরো ফ্যামিলি নিয়ে।ডানদিক থেকে যেতে শুরু করলাম।আমারদের মধ্যে কেউ কেউ ক্যামেরা,মোবাইল ফোন বের করতে শুরু করল ছবি নিবে তাই।ফুল ক্ষেতের আইল দিয়ে যেতে বাধা নেই।প্রথমে আমাদের সমনে পড়ল গাদাফুলের ক্ষেত।আহ! কি অপরূপ হলুদ,লাল ফুলের গাদা ফুলের ক্ষেত।সারি সারি গাদা ফুলের গাছ।ফোট সেসশ চলল কিছু সময়।শুধু একটি নয় শত শত গাদা ফুল ক্ষেত।গাদা ফুল ক্ষেত পেরিয়ে যেতেই জারবেরা ফুলের ক্ষেত।গ্রীনহাউস তৈরী করে ভিতরে জারবেরা ফুলের চাষ করা হয়েছে।মনে ভরে গেল জারবেরা ফুল দেখে।বিভিন্ন রঙের ফুল।সাদা,লাল,ক্রীম কালার,লিপস্টিক কালার আরো নাম না জানা রঙের জারবেরা ফুল।আমরা জানতে চাইলাম কেন এই গ্রীনহাউস শেড তৈরী করা হয়েছে।এই জারবেরা ফুল অতিরিক্ত রোদ-বৃষ্টি-শীত সহ্য করতে পারে না তাই এই গ্রীনহাউস।জারবেরা ফুলের মালিক পক্ষ থাকায় সবাইক কিছু বিভিন্ন রঙের জারবেরা ফুল কিনল।শত শত জারবেরা ফুলের শেড দেখেই সবারই মন জুড়িয়ে যাবে।জীবন এমন ফুলের বাহার আগে কখনো দেখেনি।
গদখালী


একটু যেতেই স্থানীয় কিছু মানুষের সাথে কথা হল এই ফুল চাষ কবে কখন থেকে শুরু হল।এই গদখালী-পানিসারাকে কেউ কেউ বলেন ফুলের রাজ্য,কেউ কেউ বলেন বাংলাদেশের নেদারল্যান্ড।বাংলাদেশে প্রথম বাণিজ্যিক ভাবে ফুলের চাষ করা হয় এই গদখালী-পানিসারাতে।কিভাবে এই ফুলের চাষ শুরু হল?জানা যায় এই ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের সেরালী সর্দার ১৯৮২ সালের শেষের দিকে এই দেশে বাণিজ্যিক ভাবে ফুল চাষের গোড়া পত্তন করেন।তিন দশকে এই ঝিকরগাছা উপজেলায় তৈরী হয়েছে এক সেরালী থেকে সাড়ে পাচ হাজারেরও বেশি সেরালী।ফুলচাষ ও কেনা-বেচার সাথে জড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন এই এলাকার   ৫০ হাজার মানুষ।মূলত ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত জমে উঠে ফুলের বাণিজ্য।অনুকূল আবহাওয়ার কারনে যেমন এই সময় ফুলের উৎপাদন ভাল হয় তেমনি এই সময়টাতে নানান পারিবারিক,সামাজিক,জাতীয়দি অনুষ্ঠান বেশি হয়।আমাদের দেশের মোট উৎপাদিত ৭৫ ভাগই এই এলাকার।আর তা থেকে আয় হচ্ছে বছরে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা।

কথা শেষে কিছু সামনে যেতেই গোলাপ ফুলের ক্ষেত।আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আনন্দের আত্নহারা হয়ে গেল।সারিবদ্ধ শত শত গোলাপের ক্ষেত।অনেক আনন্দ সবার মনে এই সকল বিভিন্ন রঙের ফুল দেখে।আবার সামনেই দেখলাম অসম্ভব সুন্দর ফুল গ্ল্যাডিওলাস রঙ বেরঙ্গের ফুলের ক্ষেত।লাল,সাদা,গোলাপী,হলুদ,বেগুনি নানান রঙ্গের ফুল।আমরা সবাই পছন্দ মত কিছু গ্ল্যাডিওলাস ফুল কিনলাম।সবাই এখানে আবার ক্যামেরাতে বন্ধী হলাম।আমরা সারা ফুলের মাঠে ঘুরা ঘুরে বিভিন্ন ধরনের ফুল ক্ষেত দেখলাম।সন্ধ্যা না হতেই আবার পানিসারা মোড় থেকে ভ্যান নিয়ে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে ছোট বাজার গদখালীতে।আমি কখনোই ভুলবনা এমন সৌন্দর্য্য ভরা এই গদখালী-পানিসারা ফুল ক্ষেত।


Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post

ads

Post ADS 1

ads

Post ADS 1