Header AD

বিশ্ব খ্যাত ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের নিভৃতে লুকিয়ে আছে পর্যটকদের আকর্ষন করার মত একটি দর্শনীয় স্থান

 সুন্দরবন দেখার উদ্দেশে সাতক্ষীরায় সৌন্দর্যের অপর লীলায় সজ্জিত বিশ্ব ঐতিহ্য সর্ব বৃহৎ সন্দর বনের কলে নির্মিত এই আকাশ লীলা পর্যটন কেন্দ্রে।আমরা রওনা হলাম সাতক্ষীরার উদ্দেশে।


 সুন্দরবন



বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের কোণ ঘেষে গড়ে ওঠা সাতক্ষীরা।যার প্রবেশ পথেই রয়েছে সারি সারি নান্দনিক তোরণ।বঙ্গোসাগর বিধৌত এই সাতক্ষীরা জেলার আদি নাম আমরা জানতে পারি ব্যাঘ্রতট,বাগ্রী,সমতট ও বুড়ন।সাতক্ষীরা সম্পর্কে আমরা আরো জানতে পারি ১৮৬১ সালে যাশোর জেলার অধীনে ৭ টি থানা নিয়ে সাতক্ষীরা মহাকুমা গঠিত হয়।১৮৮২ সালে খুলনা জেলা প্রতিষ্ঠা হলে সাতক্ষীরা খুলনা জেলার একটি মহাকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।এবং সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে জেলায় উন্নিত হয়।আমরা প্রথম গেলাম সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ভমরা স্থল বন্দরে।এখান থেকে কলকাতার দূরত্ব মাত্র ৬২ কিলোমিটার।আমরা অনেক সময় ঘুরে ঘুরে দেখলাম।এই ভমরা স্থল বন্দর থেকে অনেক অংশ বাণিজ্য হয়।অনেক ভাল লাগল দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চিংড়ি সহ অন্যান্য সকল মৎস্য।আমরা যেন দেখে শেষ করতে পারছি না মাছের ঘের দেখে।যত দূর চোখ যায় মাছের ঘের আর ঘের।আরো বেশি ভাল লাগল জানতে পেরে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম আম রপ্তানি করা হয় এই সাতক্ষীরা থেকে।অনেক আনন্দ পেলাম সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় মৃৎ শিল্প দেখে।আপনাকেও মন কাড়বে এই শিল্প।এই কলারোয়া উপজেলার মাটির তৈরী এই নান্দনিক টালি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়।এই সাতক্ষীরা অঞ্চলের সুস্বাদু মধু আর কোথায়ও পাওয়া যায় না।এই অঞ্চলে খলিশা ফুলের মধু আর কোথায় পাওয়া যায় না।আমাদের মধ্যে অনেকেই এখানকার গ্রামের মানুষের নিকট থেকে মধু ক্রয় করল।উল্লেখ্য সাধারনত এই খলিশা ফুল সাতক্ষীরা ছাড়া আর কোয়ায় ফুটে না।

আমাদের শহরে সাধারনত ভাল খাবার হোটেল গুলোতে খাবারে এক ধরনের ঝাল ব্যবহার করে থেকে।এই ঝালের নাম চুই ঝাল ।যা এই সাতক্ষীরাতে পাওয়া যায়।আমরা চুই ঝাল দেখলাম যা দেখতে পান গাছের মত।যা এক ধরনের পরগাছা।আমরা স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে জানতে পারি এই সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলাতে গৌরব উজ্জ্বল অতীত,ভারত বর্ষের প্রখ্যাত ডাক্তার এবং পশ্চিম বঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী  ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় এবং ভারতের সাবেক সেনা প্রধান শঙ্কর রায় চৌধুরী এই দেবহাটার টাউন শ্রীপুর গ্রামের সন্তান।আমরা আমরা গেলাম দেবহাটা উপজেলা পরিষদের কাছেই প্রায় ৬ বিঘা জমির উপর বিশাল বট গাছ।যার নাম গনবিবির বট গাছ।এর শাখা-প্রশাখা এতই বেশি যে কোনটি যে প্রাধান দেখে বোঝা যায় না।আপনি নিজেও খুজে পাবেন বলে মনে হয় না।এখানে বেশ কিছু ইতিহাস জানতে পারলাম।বাংলার বার ভূইয়াদের অন্যতম  রাজা প্রতাপাদিত্যের যশোর রাজ্যের রাজধানী ছিল সাতক্ষীরার শ্যমনগরের ধূমঘাট।আমরা আরো জানতে পারলাম অনেক মসজিদ ও মন্দিরের নির্মাতা প্রতাপাদিত্যের রাজত্বকালিন যে সব নিদর্শন ছড়িয়ে আছে শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলায় তা আমরা অনেক সময় ধরে দেখলাম।আমাদের মধ্যে অনেকেই ছবি নিল এখাকার সাথে।আমাদের বাংলার ইতিহাসের আরো অনেক কিছু জানতে পারলাম এখান থেকে।বিশেষ একটা গান “জনতার সংগ্রাম চলবেই” এ গানের গীতিকার সিকান্দার আবু জাফর এবং সুরকার শেখ লুতফুর রহমানের জন্ম এই সাতক্ষীরা জেলাতে।আমরা এখানের আরো ইতিহাস ঘেটে জানলাম এই জেলায় আরো আছেন গুনী ব্যক্তিদের মধ্যে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক খান বাহাদুর আহসানুল্লাহ,সাহিত্যিক মুহাম্মাদ ওয়াজেদ আলী,জাতীয় অধ্যাপক ডাক্তার এম আর খান,সংগীত শিল্পী নিলুফা ইয়াসমিন এবং সাবিনা ইয়াসমিন সহ আরো অনেক কৃত্তিমান ব্যক্তিত্ব।এছাড়াও সাম্প্রতিক আমাদের জাতীয় ক্রীকেট দলের আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ক্রীকেট তারকা মুস্তাফিজুর রহমান ও সম্য সরকার এই সাতক্ষীরায়।

এর পর আমরা দেখলাম ঐতিহাসিক প্রবাশপুর শাহি মসজিদ,তেতুলিয়া জামে মসজিদ,নলতা পাক রওজাশরীফ,পঞ্চমন্দির,শ্যামসুন্দর মন্দির,ছয় ঘড়িয়ার জোড়াসিক মন্দির ইত্যাদি দেখতে গেলাম।অসাধারন সময় এখানে পার করলাম।

এবার রওনা হলাম সুন্দরবনের দিকে।বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিম কোণে পাচটি জেলা বিশ্বের সর্ববৃহত ম্যানগ্রোভ বনভূমির সুন্দরবনের অবস্থান।এই বনভূমি গংগা  ও বক্ষ্মপুত্র মোহনায় অবস্থিত।এবং বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গো জুড়ে বিস্তৃত। ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে।আমরা বইয়ে পড়েছি ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত পায় এই সন্দরবন।এর পর আমরা সুন্দরবনের গভীরে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হলাম।একটা ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম।একটু ভিতরে যেতেই দুপাশে সবুজের সমারহ যা সকলের মন কাড়ে।আমরা যাত্রা শুরু করলাম সুন্দরবনের মাঝখান দিয়ে অবস্থিত বসুন্ধরা খাল দিয়ে যাচ্ছি।খালের দুপাশে চমৎকার সব গাছ ।আমরা যত বেশি ভিতরে যাচ্ছি তত যেন সব কিছু নিরব হয়ে যাচ্ছে।জীব ও বৈচিত্রে ভরপুর এই বনে রয়েছে কেওড়া,সুন্দরী,গেওয়া,গর্জন,পাইন এছাড়া দেখতে পেলাম গোলপাতা নানান প্রজাতির গাছ।চারদিক অসম্ভব সুন্দর ।আমরা জানতে পারলাম সুন্দরবনের নদী-নালা এবং জলাশায় গুলোতে পাওয়া যায় প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ।এর মধ্যে প্রায় ২০ প্রজাতির চিংড়ি মাছ,৭ প্রজাতির কাকড়া,রয়েছে ৬ প্রজাতির ঝিনুক।এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।আমরা কিছু জেলেদেরকে দেখতে পেলাম।কথা হল তাদের সাথে।তারা আমাদেরকে বলল তারা এখানে নিয়মিত এখানে মাছ আর কাকড়া ধরে থাকেন।তারা আমাদেরকে জানাল যে এখানে চিংড়ি,ভেটকি সহ লোনা পানির সকল প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়।

সন্দরবনে এই সাতক্ষীরা অঞ্চলে রয়েছে ব্যাতিক্রম ধর্মী সমুদ্রসৈকত মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত।সাতক্ষীরা শ্যমনগরের মুন্সিগঞ্জ থেকে আমরা একটি স্পিড বোর্ড নিয়ে চুনা নদী,মালঞ্চি নদী পার হয়ে টাটখা হয়ে গেলাম কলাগাছিয়া নদীর তীরে অবস্থিত কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দের দিকে।অপরূপ সৌন্দর্য্যের লিলা আপনাকেও মাতিয়ে তুলবে।সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল আমরা যখন নৌযান ভিড়ায়ে পর্যটন কেন্দ্রে গেলাম বনের একদল বানর আমাদেরকে ঘিরে ধরল।আপনাকে ধরবে।বেশ দারুন এক মুহূর্ত।আপনার আমার মত পর্যটকদের কাছ থেকে খাবার পেলেই ওরা খুশি।গভীর বনের ভিতরে কাঠ দিয়ে নির্মিত প্রায় অর্ধ কিলোমিটার জুড়ে পায়ে চলার পথ বেয়ে আমরা আরো ভেতরে গেলাম।আমাদের মত এই পথেই পর্যটকরা এই পথেই চলাচল করেন।আমরা বইয়ে পড়েছি সুন্দরবনের গাছের রয়েছে শ্বাসমুল।আমরা দেখে যেন মিলিয়ে নিলাম।এই শ্বাসমূলের সাহায্যে এরা শসনের জন্যে বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহন করতে পারে।অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচিত হয় এই সুন্দরবন।এখান থেকে সংগৃহিত হয় নানান কাজের ব্যবহার উপযোগী বনবৃক্ষ।আহরিত হয় প্রচুর পরিমানে মধু,মোম ও মাছ।

এর পরেই আমরা গেলাম সুন্দরবনের সাতক্ষীরার মান্দারবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতে।এই সমুদ্র একটি অসাধারন সমুদ্রসৈকত ।আমাদের মত হাজারো পর্যটক এসেছেন।এই সমুদ্রসৈকতে যে প্রচুর পরিমানে লাল কাকড়া পাওয়া যায় দেখেই বুঝতে পারলাম।এখান থেকে দেখা যায় সূর্যাদয় এবং সূর্যাস্ত

আমরা এরপর দেখতে গেলাম সুন্দর বনের সামনে নির্মানকরা অপরূপসৌন্দর্য্যের আকাশলীলা ইকোটোরিজম সেন্টার যা দেখে সবার ই মন জুড়িয়ে যায়এবং বিশ্বের সর্ববৃহত ম্যনগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন ছাড়াও এখানে রয়েছে জেলাপ্রশাসকের  উদ্দ্যোগে নির্মিত নানান বিনোদন কেন্দ্রতাঁর মধ্যে আমরা এসেছি প্রায় ২০ একর এলাকা জুড়ে নির্মিত “আকাশ লীলা” ইকোট্যুরিজম সেন্টারেচারদিক পানি আর দূরে বনের গাছ-গাছালি আমরা এখান থেকে জানতে পারলাম এই শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুসাঈদ মুহাম্মাদ মঞ্জুরুল আলমের নিজেস্ব প্রচেষ্টা এবং উৎসাহের ফলেই তৈরী হয়েছে এই ইকোট্যুরিজম সেন্টারআমরা যখন এখানে এলাম তখন ভাটার সময়তাই আশে-পাশে খালি জায়গা আছেএই জায়গা গুলো জোয়ারের সময় পানিতে পরিপূর্ন হয়ে যায় শুধু মাত্র হাটার রাস্তা থাকেবেশ ভালই লাগেএই এলাকা জুড়ে অনেক চলার পথএখানে আমাদের মত পর্যটকদের থাকার জায়গাও রয়েছেএছাড়াও আমরা এখানে দেখতে পেলাম ফিস একোরিয়াম বা মাছের জাদুঘরআমরা বেশ সময় পার করলাম এই মাছের জাদুঘরেএই জাদুঘরে রয়েছে এই অঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ
সাতক্ষীরার এই সুন্দরবন আমাদেরকে বেশকিছু দিন অনেক আনন্দ দিলসারা জীবন মনের মধ্যে দাগ কেটে থাকবে এই সাতক্ষীরার সুন্দরবন

Post a Comment

Post a Comment (0)

Previous Post Next Post

ads

Post ADS 1

ads

Post ADS 1